২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস। আশুলিয়ায় তখন মজুরির বৃদ্ধির আন্দোলন তুঙ্গে। দফায় দফায় সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসন শ্যমিক নেতাদের সাথে বৈঠক করছে। উদ্দেশ্য একটাই কিভাবে শ্রমিকরা কাজে মনোযোগ দেয়। এ সময় শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ রেখে প্রায় এক সপ্তাহ ব্যাপী কর্মবিরতি পালন করছিল। শ্রমিকরা কারখানায় আসছিল আর কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়ে যাচ্ছিলো। ফলে গার্মেন্টস মালিকরাও বিপাকে পড়েছিল। এ আন্দোলনের একটি বৈশিষ্ট ছিল তা হলো-কোন প্রকার ভাংচুর ছাড়াই শান্তিপূর্ণ আন্দোলেন।

ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বায়ারদের অর্ডার করা পণ্য সঠিক সময়ের মধ্যে শিপমেন্ট করতে পারবেন কি-না তা নিয়ে সংশয়ে পড়েছিল মালিকরা। সড়কেও গাড়ী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ এসে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরের দিন জামগড়া শিমুলতলা এলাকা থেকে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে শ্রমিক আওয়াজের আশুলিয়া প্রতিনিধি হিসাবে আমি জেলা পুলিশের একটি দলের সাথে ইউনিক বাজারের কাছে যাচ্ছিলাম। এ সময় হঠাৎ করে কে বা কারা উঁচু ভবনের ছাদ থেকে ঢিল মারে পুলিশের গায়ে।

পুলিশ তখন চড়াও হয়ে ঐ ছেলেটিকে আটক করে মারধর করতে করতে ধরে নিয়ে আসে। ঐ সময় আমি মোবাইল ফোন দিয়ে তার ছবি তোলার চেষ্টা করি। তখন পুলিশ আমার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। সে সময় পুলিশ আমাকে মারধর করে। সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় পত্র দেখানোর পরও আঘাত বন্ধ করেনি। এ সময় অামাকে এত মারধর করে  যে আমি প্রায় ১৫দিন কোন কাজ করতে পারিনি। বাসায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এ সময় কোন প্রতিবাদ বা সভা-সমাবেশ হয়নি কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে। কারণ পরিবেশ এতই খারাপ ছিল যে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে কোন কর্মসূচি দেওয়ার সুযোগটুকু পায়নি সাংবাদিক সংগঠন বা শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা। এ সময় ৭ জন শ্রমিক নেতাকেও গ্রফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।


শ্রমজীবি মানুষ হিসাবে এবং শ্রমজীবি মানুষের কাগজ হিসাবে শ্রমিক আওয়াজে আমি স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকি। যাতে নিজের এবং শ্রমজীবি মানুষের কথা শ্রমিক আওয়াজে উঠে আসে। এ সময় ছবি তোলার মত দামি মোবাইলটিও কেড়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাশাপাশি অসুস্থতার কারণে কারখানায় কাজে যোগদিতে পারিনি আরও বেশ কিছু দিন। এতে শ্রমজীবি মানুষ হিসাবে পরিবারে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।


আমি আহত হয়ে চিকিৎসা নেয়ার সময় শ্রমিক আওয়াজ এর সম্পাদক জাফর আহমদ ভাই এবং সংগঠকবৃন্দ ও কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা আমাকে দেখতে আসে। তারপরও থানায় কোন অভিযোগ বা মামলা করেনি ঐ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মোবাইলটি ভেঙ্গে ফেলে আর মেমোরি কার্ডটি নিয়ে যায়। শুনেছি মেমোরি কার্ডটি নিয়ে জমা দেয় সাভারের সার্কেল এ এস পি কাছে। মেমোরিটি তারা দেখে নেতাদের কাছে বলে ছেলেটি কে। কেন ছবি তুলেছে? ওকে খবর দাও থানায় আসতে।


তারপর সেখানে গেলে শ্রমিক নেতাদের  জিজ্ঞাসা করে ও কাদের সংগঠন করে ? সব নেতারা আমাকে দেখেই চিনতে পারে। শ্রমিক নেতারা আমার পরিচয় জানায়। তারা জানায়, আমি শ্রমিক আওয়াজ পত্রিকার আশুলিয়া প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করি। এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাভার আশুলিয়া শাখার সাথে যুক্ত আছি। শ্রমিক নেতা কেএম মিন্টু এবং শ্রমিক নেতা মন্জুরুল ইসলাম মন্জুদের সাথে সংগঠন করে। এ সময় আশুলিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেন জয়, শ্রমিক নেতা আল কামরান, তুহিন চৌধুরীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। 

এরপর এএস পি নাজমুল হাসান বলেন, ইকবাল ঐ শ্রমিক আপনার কি হয় ? আপনি ওকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি, আমি ওকে চিনি না। আমি তাকে ছাড়াতে আসিনি। আমি শ্রমিক আওয়াজ পত্রিকার সাংবাদিক। ওকে পুলিশ মারধর করাতে আমি ছবি তুলেছি মাত্র।

ঢাকা জেলা পুলিশ ভেবেছেন আমি ওকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছিলাম। তারপরে আস্তে আস্তে সমাধানের পথে আসে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস চলছে। শুনেছি আমার মেমোরি কার্ডটি এখন পর্যন্ত থানায় জমা আছে। ফেরত দেয়া হয়নি। মোবাইল ফোনটি আগেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।


শ্রমিকদের সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের জেল-নির্যাতন ও সংবাদপত্র কর্মী হিসাবে আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবো-যদি শ্রমিকরা জীবনমান মজুরি পায়। মজুরি নির্ধারণে আশা করি শ্রমিকদের জীবন মানের বিষয়টি মাথায় রাখবে মজুরি বোর্ড।

" />
sa.gif

২০১৬ সালের ডিসেম্বর
আশুলিয়ায় মজুরি আন্দোলনের সেই দুঃসহ স্মৃতি
ইকবাল হোসেন :: 12:38 :: Friday January 19, 2018


২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস। আশুলিয়ায় তখন মজুরির বৃদ্ধির আন্দোলন তুঙ্গে। দফায় দফায় সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসন শ্যমিক নেতাদের সাথে বৈঠক করছে। উদ্দেশ্য একটাই কিভাবে শ্রমিকরা কাজে মনোযোগ দেয়। এ সময় শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ রেখে প্রায় এক সপ্তাহ ব্যাপী কর্মবিরতি পালন করছিল। শ্রমিকরা কারখানায় আসছিল আর কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়ে যাচ্ছিলো। ফলে গার্মেন্টস মালিকরাও বিপাকে পড়েছিল। এ আন্দোলনের একটি বৈশিষ্ট ছিল তা হলো-কোন প্রকার ভাংচুর ছাড়াই শান্তিপূর্ণ আন্দোলেন।

ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বায়ারদের অর্ডার করা পণ্য সঠিক সময়ের মধ্যে শিপমেন্ট করতে পারবেন কি-না তা নিয়ে সংশয়ে পড়েছিল মালিকরা। সড়কেও গাড়ী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ এসে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরের দিন জামগড়া শিমুলতলা এলাকা থেকে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে শ্রমিক আওয়াজের আশুলিয়া প্রতিনিধি হিসাবে আমি জেলা পুলিশের একটি দলের সাথে ইউনিক বাজারের কাছে যাচ্ছিলাম। এ সময় হঠাৎ করে কে বা কারা উঁচু ভবনের ছাদ থেকে ঢিল মারে পুলিশের গায়ে।

পুলিশ তখন চড়াও হয়ে ঐ ছেলেটিকে আটক করে মারধর করতে করতে ধরে নিয়ে আসে। ঐ সময় আমি মোবাইল ফোন দিয়ে তার ছবি তোলার চেষ্টা করি। তখন পুলিশ আমার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। সে সময় পুলিশ আমাকে মারধর করে। সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় পত্র দেখানোর পরও আঘাত বন্ধ করেনি। এ সময় অামাকে এত মারধর করে  যে আমি প্রায় ১৫দিন কোন কাজ করতে পারিনি। বাসায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এ সময় কোন প্রতিবাদ বা সভা-সমাবেশ হয়নি কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে। কারণ পরিবেশ এতই খারাপ ছিল যে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে কোন কর্মসূচি দেওয়ার সুযোগটুকু পায়নি সাংবাদিক সংগঠন বা শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা। এ সময় ৭ জন শ্রমিক নেতাকেও গ্রফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।


শ্রমজীবি মানুষ হিসাবে এবং শ্রমজীবি মানুষের কাগজ হিসাবে শ্রমিক আওয়াজে আমি স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকি। যাতে নিজের এবং শ্রমজীবি মানুষের কথা শ্রমিক আওয়াজে উঠে আসে। এ সময় ছবি তোলার মত দামি মোবাইলটিও কেড়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাশাপাশি অসুস্থতার কারণে কারখানায় কাজে যোগদিতে পারিনি আরও বেশ কিছু দিন। এতে শ্রমজীবি মানুষ হিসাবে পরিবারে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।


আমি আহত হয়ে চিকিৎসা নেয়ার সময় শ্রমিক আওয়াজ এর সম্পাদক জাফর আহমদ ভাই এবং সংগঠকবৃন্দ ও কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা আমাকে দেখতে আসে। তারপরও থানায় কোন অভিযোগ বা মামলা করেনি ঐ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মোবাইলটি ভেঙ্গে ফেলে আর মেমোরি কার্ডটি নিয়ে যায়। শুনেছি মেমোরি কার্ডটি নিয়ে জমা দেয় সাভারের সার্কেল এ এস পি কাছে। মেমোরিটি তারা দেখে নেতাদের কাছে বলে ছেলেটি কে। কেন ছবি তুলেছে? ওকে খবর দাও থানায় আসতে।


তারপর সেখানে গেলে শ্রমিক নেতাদের  জিজ্ঞাসা করে ও কাদের সংগঠন করে ? সব নেতারা আমাকে দেখেই চিনতে পারে। শ্রমিক নেতারা আমার পরিচয় জানায়। তারা জানায়, আমি শ্রমিক আওয়াজ পত্রিকার আশুলিয়া প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করি। এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাভার আশুলিয়া শাখার সাথে যুক্ত আছি। শ্রমিক নেতা কেএম মিন্টু এবং শ্রমিক নেতা মন্জুরুল ইসলাম মন্জুদের সাথে সংগঠন করে। এ সময় আশুলিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেন জয়, শ্রমিক নেতা আল কামরান, তুহিন চৌধুরীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। 

এরপর এএস পি নাজমুল হাসান বলেন, ইকবাল ঐ শ্রমিক আপনার কি হয় ? আপনি ওকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি, আমি ওকে চিনি না। আমি তাকে ছাড়াতে আসিনি। আমি শ্রমিক আওয়াজ পত্রিকার সাংবাদিক। ওকে পুলিশ মারধর করাতে আমি ছবি তুলেছি মাত্র।

ঢাকা জেলা পুলিশ ভেবেছেন আমি ওকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছিলাম। তারপরে আস্তে আস্তে সমাধানের পথে আসে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস চলছে। শুনেছি আমার মেমোরি কার্ডটি এখন পর্যন্ত থানায় জমা আছে। ফেরত দেয়া হয়নি। মোবাইল ফোনটি আগেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।


শ্রমিকদের সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের জেল-নির্যাতন ও সংবাদপত্র কর্মী হিসাবে আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবো-যদি শ্রমিকরা জীবনমান মজুরি পায়। মজুরি নির্ধারণে আশা করি শ্রমিকদের জীবন মানের বিষয়টি মাথায় রাখবে মজুরি বোর্ড।



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution